ঢাকামঙ্গলবার , ১৩ ডিসেম্বর ২০২২
  1. International
  2. অন্যান্য
  3. অর্থনীতি
  4. আন্তর্জাতিক
  5. উৎসব
  6. খেলাধুলা
  7. চাকুরী
  8. জাতীয়
  9. দেশজুড়ে
  10. ধর্ম
  11. পরামর্শ
  12. প্রবাস
  13. ফরিদপুর
  14. বিনোদন
  15. বিয়ানীবাজার
আজকের সর্বশেষ সবখবর

শ্রদ্ধাঞ্জলিঃ শহীদ বুদ্ধিজীবী মাওলানা অলিউর রহমান…. বশির আহমদ জুয়েল

ডাক বাংলা
ডিসেম্বর ১৩, ২০২২ ৬:১৫ অপরাহ্ণ
Link Copied!

আওয়ামী ওলামালীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতির নাম ক’জন ওলামীলীগ কর্মী জানেন তা আমার অজানা। একজন আলেম ও চিকিৎসক ছিলেন এর প্রতিষ্ঠাতা। কে তিনি কী তাঁর পরিচয় তা জাতি না জানলেও তিনি মা, মাটি ও মাতৃভূমির জন্য ছিলেন নিবেদিত প্রাণ। জীবনদানে শোধ করেছেন সবুজ শ্যামল বাংলার ঋণ। লাল-সবুজের পতাকায় রেখে গেছেন তাঁর রক্তদাগ। বর্তমান প্রজন্মের কাছে তিনি কেবল কি অজানা? না তার চিন্তা চেতনাকে জানা থেকেও বঞ্চিত করা হয়েছে প্রজন্মকে। ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর দেশের সূর্য সন্তানদের হত্যা করে বাংলাদেশকে মেধাশুন্য করতে চেয়েছিল পাকহায়েনা ও তার দোসররা। সেদিনই তার মৃত দেহটি পাওয়া যায় রায়ের বাজারে। তিনি হচ্ছেন সিলেটের কৃতিসন্তান শহীদ বুদ্ধিজীবি মাওলানা অলিউর রহমান। বর্তমানে সিলেট নগরের ৩৮ নং ওয়ার্ডের মইয়ারচর গ্রামের হযরত মাওলানা হাবিবুর রহমান খোরাসানীর জ্যেষ্ট পুত্র। সিলেট জেলা যুবলীগের সাবেক সহ-সভাপতি ও হাজী আব্দুস সাত্তার উচ্চ বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক আব্দুর রহমান খোরাসানীর (জুনায়েদ খোরাসানী) গর্বিত পিতা।
মুক্তিযুদ্ধের কিংবদন্তি চিন্তাশীল দার্শনিক শহীদবুদ্ধিজীবি মাওলানা অলিউর রহমান ছিলেন বঙ্গবন্ধুর একান্ত সহচর, আওয়ামী ওলামালীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। একাত্তরের স্রোত ও পরিবেশের বিপরীতে তিনি বঙ্গবন্ধুর চিন্তা চেতনা সংগ্রামকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য যেভাবে কাজ করে গেছেন ইতিহাসে তা বিরল। বঙ্গবন্ধুর প্রতি নিঃস্বার্থ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার এক বিরল ঘটনা। বিশেষ করে বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা আন্দোলনকে প্রতিষ্ঠিত করার পিছনে তিনি ছিলেন একজন মহান চিন্তাবিদ। কিন্তু একজন আলেম হয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে এমন বলিষ্ঠ নেতৃত্ব প্রদান সহ্য হয়নি পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসরদের। এই আলেমকে তারা কালো রাতে নির্মমভাবে হত্যা করে। এদেশকে মেধাশূন্য করার ও দেশপ্রেমিক বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করার মিশনে নেমেছিল বর্বর পাকিস্তান হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় রাজাকার বাহিনী। সেই মহান বুদ্ধিজীবিদের আমরা শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি। এপ্রজন্মের কাছে শিক্ষাবিদ, ডাক্তার, প্রকৌশলি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক বুদ্ধিজিবীদের সাথে ১৯৭২ সালের তালিকায় তাঁর নাম থাকলেও পরবর্তীতে তা অদৃশ্য কারণে গায়েব হয়ে যায়।
বঙ্গবন্ধু ছয় দফা ঘোষণা করে অধিকার আদায়ের জন্য সংগ্রাম চালু করলে লেখক গবেষক মাওলানা অলিউর রহমান খোরাসানী জনমত গঠনের জন্য মাঠে ময়দানে বঙ্গবন্ধুর সাথে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। আওয়ামী উলামালীগের উদ্দ্যোগে স্বাধীকার আন্দোলনের পক্ষে মহাসমাবেশ হয়। সেই সভায় সভাপতিত্বও করেন মাওলানা অলিউর রহমান। বঙ্গবন্ধু সেখানে প্রধান অতিথির ভাষণ দিয়েছিলেন। তিনি তখন স্বাধীকার আন্দোলনের পক্ষে জনমত সৃষ্টির লক্ষ্য, বাঙালি মুসলিম সমাজকে জাগিয়ে তুলতে কলম ধরেন। লিখেন একের পর এক আলোচিত গ্রন্থ। তারমধ্য উল্ল্যেখযোগ্য , শরীয়তের দৃষ্টিতে ছয় দফা, ছয় দফা ইসলাম বিরোধী নহে, যুক্তির কষ্টি পাথরে ছয় দফা, জয় বাংলা ইসলাম বিরোধী স্লোগান নহে ইত্যাদি।
এ বইগুলো দেশব্যপী ব্যাপক সাড়া জাগায়। স্বাধীকার আন্দোলনে মানুষের মাঝে উৎসাহ উদ্দীপনা বাড়িয়ে দেয়। তিনি রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বিরাট চ্যালেঞ্জের মুখামুখি হন। আওয়ামী ওলামালীগের সভাপতি হিসেবে যোগ্যতা ও দক্ষতার পরিচয় দেন ।
বঙ্গবন্ধুর পক্ষে একাত্তরের পূর্ব থেকেই জনমত তৈরি ও একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য ইতিহাসে তিনি অমর হয়ে আছেন। ছয় দফা সমর্থন, মহান মুক্তিযুদ্ধ ও জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে ঐতিহাসিক অবদান ও জনমত গঠনকে মেনে নিতে পারে নি হানাদার বাহিনী ও তার দোসররা। ফলে ১৪ ডিসেম্বরে আল বদর, আল শামসের হাতে মাওলানা অলিউর রহমান শহীদ হয়েছিলেন।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরামর্শ ও একান্ত ইচ্ছায় ১৯৬৬ সালে মাওলানা অলিউর রহমানের হাত ধরেই আওয়ামী ওলামালীগ প্রতিষ্ঠিত হয়। বঙ্গবন্ধু যখন ১৯৬৬ সালে ৬ দফা ঘোষণা করেন তখন পাকিস্তান সরকারের বেতনভুক্ত বহু আলেম উলামা ছয় দফাকে ইসলাম বিরোধী বলে ঘোষণা দেন়। সেই সময় মাওলানা অলিউর রহমান ‘ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে ৬দফা’ নামক একটি বই লিখে বঙ্গবন্ধুর ছয় দফার কোন দাবিই যে ইসলামি শরিয়াহর বিরোধী নয় তা প্রমাণ করেন। তার এই ‘ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে ছয় দফা’ বইটি সেই সময় পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে বিপুল আলোড়ন সৃষ্টি করে।
বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে কেন্দ্রীয়ভাবে ১৯৬৬ সালে মাওলানা অলিউর রহমানের ‘ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে ছয় দফা’ বইটি প্রত্যেক আওয়ামী লীগ কর্মীর হাতে পৌঁছে দেয়া হয়। পাকিস্তানি শাসকদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে মাওলানা অলিউর রহমানই ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধুর সমর্থনে বিপুল আলেম উলামাদের নিয়ে ছয় দফার পক্ষে জনমত গঠনে কাজ করেন। তিনি কেবল একজন আলেম বা মাওলানাই ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন সুনামখ্যাত হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকও। ‘আরোগ্য কুটির’ নামে ঢাকার কেরানিগঞ্জে তাঁর চিকিৎসালয় ছিলো।
‘মুক্তিযোদ্ধা শহীদ মাওলানা অলিউর রহমান: জীবন ও সাহিত্য’ গ্রন্থে আবদুল্লাহ বিন সাঈদ জালালাবাদী লিখেছেন, ‘অলিউর রহমান ছিলেন ধর্ম মন্ত্রনালয়ের স্বপ্নদ্রষ্টা ও প্রস্তাবকারী। তিনি এব্যাপারে একটি গ্রন্থও লিখেছিলেন, স্বতন্ত্র ধর্ম দপ্তর একটি জাতীয় প্রয়োজন। তিনি ছিলেন স্বপ্ন সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠায় বঙ্গবন্ধুর একনিষ্ট সহযোদ্ধা।’
শহীদ বুদ্ধিজীবী ডা. মাওলানা অলিউর রহমানের মূল্যায়ণে, জাতীয় অধ্যাপক ও দার্শনিক দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ লিখেছেন, ‘এদেশের অনেক সোনার ছেলে স্বাধীনতা সংগ্রাম প্রাণ হারিয়েছে, শহীদ মাওলানা অলিউর রহমান তারই মধ্যে একজন।’
ভাষা আন্দোলনের স্থপতি প্রিন্সিপাল আবুল কাশেম তার স্মৃতিচারণ করেছেন এভাবে- ‘কোন কোন আলেম যে জীবন ও জগৎ সম্পর্ককে এতো আধুনিক জ্ঞান ও চিন্তা চেতনার অধিকারী হতে পারেন এবং এত বিশুদ্ধ ও প্রাঞ্জল বাংলা ভাষায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বক্তৃতা দিতে পারেন তা মাওলানা অলিউর রহমানের বক্তৃতা শোনার আগে আমি কোনোদিন কল্পনাও করতে পারিনি । একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে ও বঙ্গবন্ধুর স্বাধীকার আন্দোলনের এক মহান নেতা হিসাবে এই মাওলানার ঐতিহাসিক অবদান তাকে অমর করে রেখেছে দেশ ও জাতির কাছে।’
১৯৭২ সালে তৈরি শহীদ বুদ্ধিজীবী তালিকায় মাওলানা অলিউর রহমানের নাম আছে। কিন্তু বর্তমানে আমরা স্বাধীনতা অর্জনের সুবর্ণজয়ন্তীকে পিছু ফেলে অগ্রসর হচ্ছি আগামীর পথে। তারপরও কেনো বর্তমান তালিকায় তাঁর নাম নাই? কে দিবে এর জবাব? দেশ ও জাতির জন্য তিনি তাঁর দায়িত্ব পালন করে জীবন উৎসর্গ করে গেছেন। কিন্তু দেশ ও জাতির কি কিছুই করার নেই তাঁর প্রতি? জুনায়েদ খোরাসানী কি পারবেন তাঁর জীবদ্দশায় দেখে যেতে শহীদ বুদ্ধিজীবিদের তালিকায় তার গর্বিত পিতার নামটি? বর্তমান প্রজন্মের পক্ষে প্রশ্নটি আমারও।

সহায়ক সূত্রঃ [১] বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ : দলিলপত্র : ৩য় খণ্ড, পৃ. ৩৩২- ৩৩৬।.[২] এম আর আখতার মুকুল, আমি বিজয় দেখেছি, বিস্তারিত পৃষ্ঠা নং – ১৬৭।.[৩] দ্যা রেইপ অব বাংলাদেশ, পৃ. ২৪।.[৪] একাত্তরের দিনগুলি, পৃ. ১২৩।

বশির আহমদ জুয়েল, মন্ট্রিয়ল, কানাডা।