ঢাকাসোমবার , ১০ জানুয়ারি ২০২২
  1. International
  2. অন্যান্য
  3. অর্থনীতি
  4. আন্তর্জাতিক
  5. উৎসব
  6. খেলাধুলা
  7. চাকুরী
  8. জাতীয়
  9. দেশজুড়ে
  10. ধর্ম
  11. পরামর্শ
  12. প্রবাস
  13. ফরিদপুর
  14. বিনোদন
  15. বিয়ানীবাজার

ওমিক্রন মোকাবেলায় ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি যেন না ঘটে

নিজস্ব প্রতিনিধি,দৈনিক ডাকবাংলা ডট কম
জানুয়ারি ১০, ২০২২ ৯:৪২ অপরাহ্ণ
Link Copied!

১৩৪০ সাল নাগাদ ‘ইয়ারসিনিয়া পেসটিস’ নামের জীবাণু ‘প্লেগ’ রোগ নামে (ব্ল্যাক ডেথ) মধ্য এশিয়ায় মোঙ্গল বাহিনীর বিস্তীর্ণ সমতলে গবাদি পশুর আস্তাবল থেকে ছড়িয়ে কৃষ্ণসাগর পেরিয়ে ইউরোপের বাণিজ্য রুট ধরে আবার ইরান, মিসর, মধ্যপ্রাচ্য ও আরব পেনিনসুলা আক্রান্ত করেছিল।

জীবাণুটির মূল বাহন ছিল ইঁদুর ও উট।
১৩৪৮ সাল নাগাদ জীবাণুটি ব্রিটেন থেকে বাণিজ্য জাহাজের মাধ্যমে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে তা চালান হতে থাকল। সেই সূত্রে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে সাইপ্রাস ও মিসরের সমুদ্রবন্দরে হজযাত্রীদের মাধ্যমে তা মক্কায় পৌঁছে।

দামেস্কের পণ্ডিত ইবনে আল ওয়ার্দির ‘রিসালাত আল নাবা’তে উল্লেখ আছে, সপ্তম শতকে মেসোপটেমিয়া অঞ্চলে প্লেগ নামের রক্তবমি ও কালাজ্বরের এই প্রাণঘাতী রোগ দেখা দেওয়ার পর হজরত মুহাম্মদ (সা.) সাবধান করে বলেছিলেন, ‘আর যাই হোক এই রোগ পবিত্র কাবা শরিফে ঢুকতে পারবে না।’

তত দিনে কায়রো, প্যালেস্টাইনে প্রতিদিন গড়ে এক হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটেছিল।
ইউরোপে ১৩৫০ সালে এই রোগ থেকে বাঁচতে ইংল্যান্ডের রাজা তৃতীয় এডওয়ার্ড প্রাক-ইসলামী যুগের মুসলমানদের নিয়মে রোজা রাখতে নিয়ম জারি করলেন। তাঁর ধারণা, পুরনো আরবি চিকিৎসা প্রণালী অনুসারে খালি পেটে দিনে ১১ বার উপাসনা করলে ক্ষত ঘা থেকে বাঁচার সম্ভাবনা বেশি থাকে।

সেই সময় জার্মানির চার্চগুলো ফতোয়া দিয়েছিল, এই রোগ ইহুদিদের সৃষ্টি। তারা ইচ্ছা করে পানির কুয়া ও নদীতে বিষ মিশিয়ে দিয়েছে। সেই মোতাবেক কোলন ও অস্ট্রিয়ায় ইহুদিদের জ্বলন্ত পুড়িয়ে হত্যা করা হলো। ঘটনা বাড়াবাড়ি পর্যায়ে চলে গেলে ভ্যাটিকানের পোপ পরিস্থিতি শান্ত করতে হস্তক্ষেপ করেন।

প্রায় আড়াই কোটি মানুষের মৃত্যু ঘটায় এই ইয়ারসিনিয়া পেসটিস জীবাণু। এক-তৃতীয়াংশ জনসংখ্যা হারায় ইউরোপ। ফ্লোরেন্সেই মারা যায় এক লাখ মানুষ। ভারত মহাসাগর, কাসপিয়ান সাগর আর কৃষ্ণসাগর ঘিরে বাণিজ্যের ধরন ও ভৌগোলিক রাজনীতি তখন আমূল বদলে যায়।
ইতিহাসের পথ ধরে আজ থেকে শতবর্ষ আগে একইভাবে স্প্যানিশ ফ্লু মহামারিতে সারা বিশ্বে প্রায় পাঁচ কোটি মানুষের প্রাণহানি হয়েছিল।

বিংশ শতাব্দীতে বিজ্ঞানের উন্নতির সঙ্গে মানবজাতি আশা করেছিল ভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধটা বিগত শতাব্দীর মতো একচেটিয়া হবে না। ওষুধবিজ্ঞানের ক্রমোন্নতি আমাদের আশা জাগিয়েছিল এই অণুজীবকে নিয়ন্ত্রণ করতে।

কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় কভিড-১৯ পরিস্থিতি পর্যালাচনা করলে বিপরীত চিত্র দেখতে পাচ্ছি আমরা। করোনাভাইরাসটি প্রকৃতিগত, নাকি মনুষ্য উদ্ভাবিত—সেই বিতর্ক এখন অপ্রয়োজনীয়। প্রয়োজন দেখা দিয়েছে ভাইরাসটি নির্মূল করে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে তুলতে আমাদের ওষুধবিজ্ঞান এবং চিকিৎসাবিজ্ঞান কতটুকু কার্যকর তা প্রমাণের।

সারা বিশ্ব এখন করোনা মহামারির নতুন পর্বে উপনীত হয়েছে। যথাক্রমে ‘ওমিক্রন’ এবং ‘ফ্লোরিনা’ নামের দুই নতুন ভেরিয়েন্টের উপসর্গে আবারও ভয়ার্ত সময়ে প্রবেশ করতে যাচ্ছে সবাই। একই সঙ্গে বিগত বছরের মতো আশঙ্কা, গ্রাস করছে আমাদের অর্থনৈতিক এবং সামাজিক জীবনে।

২০২১ সালের শেষ দিকে কিছুটা স্থির অবস্থা ফিরে এলেও ২০২২ সালের শুরুতে আবার ২০২০ সালের শঙ্কা দানা বাঁধছে। অথচ গত দুই বছর মূল ভাইরাসটির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে পূর্ব অভিজ্ঞতা থাকার কারণে যেকোনো নাজুক পরিস্থিতি মোকাবেলায় আমাদের যথাযথ প্রস্তুতি থাকার কথা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক তেড্রোস অ্যাডানাম গ্যাব্রিয়ুস যখন ২০২০ সালের ১১ মার্চ করোনাভাইরাসের সংক্রমণকে ‘মহামারি’ হিসেবে চিহ্নিত করলেন, তখনো আমাদের দেশ এর বিস্তার ও বিপদ নিয়ে চিন্তিত হলেও নিশ্চুপতা ছিল লক্ষণীয়। তবে জনগণের মধ্যে চাপা উদ্বেগ ও সতর্কতা থাকলেও প্রশাসন ছিল দর্শকের সারিতে। তত দিনে চীন ছাড়িয়ে গ্লাইকোপ্রোটিনের আবরণে আচ্ছাদিত শক্তিশালী ভাইরাসটি জাপান, ইরান, সৌদি আরব, অস্ট্রেলিয়া, ইতালি, ডেনমার্ক, জার্মানি, ফ্রান্স, ইংল্যান্ডসহ ইউরোপকে আক্রান্ত করে আটলান্টিকের ওপারে কানাডা ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছে যায়। যার জের ধরে ব্যবসা-বাণিজ্য, যোগাযোগ ও পর্যটন খাতে বিশাল ধস নামে।

২০২১ সালে কভিড টিকা কর্মসূচি জনগণের মাঝে স্বস্তি ফিরিয়ে আনলেও করোনার নতুন ভেরিয়েন্টকে পুরোপুরি ঠেকাতে পারেনি।

তবে দুই ডোজ টিকা অর্থনীতির চাকা আবার নতুন উদ্যমে যেই মুহূর্তে চালু করল ঠিক সেই সময় ‘ওমিক্রন’ আঘাত হানল নতুন করে। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে করোনার উপসর্গবিহীন সর্দি-জ্বরের ‘ফ্লোরিনা’। তা আদতে কভিড ভাইরাসের নব্য চেহারা।

গত কয়েক দিনে সারা বিশ্বে প্রায় সাড়ে চার হাজার ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে বিমান শিডিউল বাতিল হয়েছে আড়াই হাজার। পাইলট এবং ক্রুদের করোনা আক্রান্তের হার বেড়েছে আশঙ্কাজনকভাবে।

সেই ধারায় বাংলাদেশ এখন বিজয় দিবসের যাবতীয় রাষ্ট্রীয় যজ্ঞ পেরিয়ে ওমিক্রনপর্বে প্রবেশের অপেক্ষায়। পাশাপাশি মধ্যবিত্ত শ্রেণি করোনা-পরবর্তী সময়ে ছুটিতে পর্যটনের দোহাই তুলে দিগ্বিদিক চষে বেরিয়েছে দেশের আনাচে-কানাচে।

কিন্তু এভাবে প্রতি ছয় মাস অন্তর করোনাভাইরাসের নতুন ভেরিয়েন্ট আসতে থাকলে এবং ক্রমাগত কয়েক মাস পর পর বুস্টার ডোজ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিলে আদতে এটি কতটা বাস্তবসম্মত সমাধান তা নিয়ে জোর বিতর্ক শুরু হয়েছে। ব্রিটেনের অণুজীব বিজ্ঞানীদের ধারণা, এটা সম্ভব নয়। এই ভাইরাসের সব সম্ভাব্য ভেরিয়েন্টের বিপক্ষে অবশ্যই আমাদের কার্যকর ব্যবস্থা খুঁজে বের করতেই হবে। করোনা অণুজীবের কাছে মানবজাতি নিশ্চয় পরাজিত হবে না।

চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা, ব্রিটেন, ইসরায়েল, ফ্রান্স আপাতত করোনাভাইরাসের বিবিধ ভেরিয়েন্টের উৎস মনে করা হলেও আসল সত্য এখনো অজানা। রোগের উপসর্গ নিয়ে গতকাল যেটা বলা হলো আগামীকাল আবার সেটি পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে। রোগটির প্রতিকার ও চিকিৎসা ঘিরে গ্রহণ-বর্জনের সমীক্ষা আগামী দিনগুলোতেও চলমান থাকবে, কোনো সন্দেহ নেই।

বাংলাদেশে করোনার নতুন ভেরিয়েন্ট মোকাবেলায় আশা রাখি পূর্বতন ভুলত্রুটিগুলোর পুনরাবৃত্তি হবে না।

তার পরও স্বাস্থ্য খাতের পাঁচটি বিষয়ে আমাদের মনোযোগী হতে হবে। সেগুলো হলো—এয়ারপোর্ট কিংবা সীমান্তে পিসিআর টেস্টের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা (কভিড টেস্ট কিটের পর্যাপ্ত সরবরাহ), যথাসময়ে জনগণকে সতর্ক করা (শেষ মুহূর্তে প্যানিক তৈরি না করা), হাসপাতালে আইসোলেশন বেডের সংখ্যা বৃদ্ধি (ভৌত অবকাঠামো), স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রণোদনার মাধ্যমে মানসিকভাবে চাঙ্গা রাখা (গত বছরের পাওনা আছে প্রচুর), সর্বসাধারণকে মাস্ক পরতে ও সোশ্যাল ডিস্ট্যান্স মেনে চলতে বাধ্য করা।

নতুন বছরে করোনার সঙ্গে বসবাসে অভ্যস্ত হওয়া এখন সময়ের ব্যাপার। এই সময়ে যেন আমাদের আবার শুনতে না হয় নিজেদের অযোগ্যতাকে ধামাচাপা দিতে কেউ বলছেন, ‘আমরা ওমিক্রনের চেয়েও বেশি শক্তিশালী!’