1. admin@doinikdakbangla.com : Admin :
বাংলাদেশকে গড়ে তোলার জন্য নতুন কর্মসূচি দরকার » দৈনিক ডাক বাংলা
রবিবার, ২৩ জানুয়ারী ২০২২, ০৩:১৪ পূর্বাহ্ন

বাংলাদেশকে গড়ে তোলার জন্য নতুন কর্মসূচি দরকার

নিজস্ব প্রতিনিধি,দৈনিক ডাকবাংলা ডট কম
  • প্রকাশের সময়: বৃহস্পতিবার, ৪ নভেম্বর, ২০২১
  • ৫২ বার পঠিত

দেশ এবং রাষ্ট্র এক নয়। দেশ প্রকৃতির সৃষ্টি, রাষ্ট্র মানুষের। পাহাড়, পর্বত, সমুদ্র, মরুভূমি ইত্যাদি দুর্ভেদ্য প্রাকৃতিক নানা কিছু দ্বারা পরিবেষ্টিত একেকটি বিশাল ভূভাগ হলো একেকটি দেশ। প্রতিটি দেশের অভ্যন্তরে ভূ-প্রকৃতিগত ও নৃগোষ্ঠীগত নানা বৈচিত্র্য লক্ষ করা যায়। দেশের সীমানাও ঠিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের বর্ণনা অনুযায়ী হয় না—কমবেশি এদিক-ওদিক হয়। রাষ্ট্রের রূপ ও প্রকৃতি রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা নির্ণয় করার চেষ্টা করেছেন। সীমানা দ্বারা চিহ্নিত ভৌগোলিকভাবে সন্নিহিত সুনির্দিষ্ট ভূভাগ, সেই ভূভাগের স্থায়ী ঐক্যবোধসম্পন্ন সুনির্দিষ্ট জনগণ, সেই ভূভাগে সেই জনগণের সরকার এবং সেই ভূভাগ ও সেই জনগণের যেকোনো বিষয়ে সেই জনগণের সিদ্ধান্ত গ্রহণের চূড়ান্ত ক্ষমতা বা সার্বভৌমত্ব—এই চারটি বিষয় হলো রাষ্ট্রের রূপ ও প্রকৃতি নির্দেশক মূল ব্যাপার। আধুনিক রাষ্ট্রে সরকার গঠিত হয় রাজনৈতিক দল দ্বারা। সে জন্য রাজনৈতিক দলকেও এখন রাষ্ট্রের অন্যতম অপরিহার্য গঠনকর উপাদান বলা যায়। আসলে রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতাই হলো রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব—যার মালিক জনগণ।

রাষ্ট্রের থাকে বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, যেমন—আইনসভা ও মন্ত্রিপরিষদ, নির্বাহী বিভাগ বা প্রশাসন ব্যবস্থা, আইন ও বিচার ব্যবস্থা, শিক্ষাব্যবস্থা, অর্থনৈতিকব্যবস্থা, নিরাপত্তাব্যবস্থা ইত্যাদি। ইউরোপে গির্জার কর্তৃত্ব আর ধর্মতন্ত্র ও রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে আধুনিক গণতন্ত্রের ও জনগণের সার্বভৌমত্বের ধারণা দেখা দেয় রেনেসাঁসের কালে। আগে একমাত্র ঈশ্বরকেই মনে করা হতো সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী। রাজতন্ত্র ও ঐশ্বরিক কর্তৃত্বের পক্ষে তখন বাইবেলীয়, কোরানীয়…যুক্তি প্রদর্শন করা হতো। আধুনিক গণতন্ত্রের ধারণা বিকশিত হওয়ার আগে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, সংগঠন করার স্বাধীনতা, সরকারের কাজের সমালোচনা করার স্বাধীনতা, অন্যায়ের প্রতিবাদ করার স্বাধীনতা স্বীকৃত ছিল না। তা ছাড়া সেকালে বিভিন্ন জাতির মধ্যে ছিল নানা ধরনের অভিজাততন্ত্র। হিন্দু সমাজে ছিল কঠোর জাতিভেদ প্রথা। ইউরোপে দাস ও ভূমিদাসদের চলতে হতো দাস-মালিকদের ও ফিউডাল লর্ডদের আদেশ-নির্দেশ অনুযায়ী।
স্টিম ইঞ্জিন, ইঞ্জিনচালিত যানবাহন ও কলকারখানা, মুদ্রণযন্ত্র ইত্যাদির প্রচলন দিয়ে আঠারো শতকের মাঝামাঝিতে সূচিত হয় শিল্প বিপ্লব। শিল্প বিপ্লব এক বিকাশমান প্রক্রিয়া। শিল্প বিপ্লব সূচিত হওয়ার আগে মানুষের কর্মকাণ্ড ও জীবন প্রয়াস দেশব্যাপী বিস্তৃত হয়নি। তখন সবই ছিল ক্ষুদ্র গণ্ডিতে, অঞ্চলে, এলাকায় সীমাবদ্ধ। শিল্প বিপ্লবের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের বিচরণ ও সম্পদের আনা-নেওয়া দেশব্যাপী বিস্তৃত হয়। মুদ্রিত পত্র-পত্রিকা ও বই-পুস্তক ক্রমেই মানুষের ভাবের আদান-প্রদানকে নিবিড়তর করে। তাতে মানুষের মধ্যে দেশভিত্তিক বা দৈশিক ঐক্যবোধ দেখা দিতে থাকে। মাতৃভাষার ও আঞ্চলিক ভাষার বৈচিত্র্য অতিক্রম করে গড়ে ওঠে জাতীয় ভাষা। এরই মধ্যে এক পর্যায়ে অনেকের মহাধারণা দেখা দেয়—আমরা যদি আমাদের দেশে আমাদের জন্য একটি ভালো রাষ্ট্র গড়ে তুলতে পারি, তাহলে সেই রাষ্ট্রে আমাদের সবচেয়ে ভালো জীবনযাপনের উপায় করা যাবে। এই ধারণাই জাতীয়তার ধারণা, দেশভিত্তিক এই বোধই জাতীয়তাবোধ, এই চেতনাই জাতীয় চেতনা। এ থেকে দেখা দেয় জাতীয়তাবাদ বা জাতিরাষ্ট্র গঠনের মতবাদ ও আন্দোলন। ইউরোপে উনিশ শতকে এবং এশিয়ায় বিশ শতকে দেখা দেয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলন। ইউরোপে প্রতিটি দেশে রাজতন্ত্র ও গির্জার কর্তৃত্ব উত্খাত করে গড়ে তোলা হয় জাতিরাষ্ট্র। আর এশিয়ায় প্রতিটি দেশে জনগণের মধ্যে পাশ্চাত্য শিক্ষা গ্রহণ করে জাতি হয়ে ওঠার এবং উপনিবেশকারী শক্তির বিরুদ্ধে স্বাধীনতাসংগ্রামের মধ্য দিয়ে জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রয়াস দেখা দেয়। আধুনিক গণতন্ত্রের ও সার্বভৌমত্বের ধারণা, সেই সঙ্গে জাতিরাষ্ট্রের ধারণা ইউরোপ থেকে পৃথিবীর সব মহাদেশে ও দেশে ছড়িয়ে পড়ে। ক্রমে রাষ্ট্রচিন্তা ও রাষ্ট্র গঠনের বহু বিচিত্র ধারণা বিকশিত হয়। অনেকে মত প্রকাশ করেন যে পৃথিবীতে মানুষের কল্যাণ সাধনের সর্ববৃহৎ ও সর্বোত্কৃষ্ট অবলম্বন হতে পারে রাষ্ট্র। প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক প্লেটো থেকেই এই ধারণা বিকশিত হতে থাকে। ভারতবর্ষে কৌটিল্য রাজ্যকে মনে করেছেন সর্ববৃহৎ ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানবীয় প্রতিষ্ঠান। তখন থেকে ভারতে রাষ্ট্রচিন্তার ধারাবাহিক বিকাশ ঘটেনি। ইউরোপের প্লেটো-অ্যারিস্টটলের পরে দীর্ঘদিন রাষ্ট্রচিন্তার ধারাবাহিক বিকাশ ঘটেনি।

শিল্প বিপ্লব চলমান আছে। বিজ্ঞান-প্রযুক্তির নতুন নতুন আবিষ্কার-উদ্ভাবন মানুষের জীবনধারা, সমাজব্যবস্থা ও রাষ্ট্রব্যবস্থাকে ক্রমাগত বদলে দিচ্ছে। বড় রকম আবিষ্কার-উদ্ভাবন বড় রকমের পরিবর্তন ঘটাচ্ছে। ইউরোপে খ্রিস্টীয় মধ্যযুগের ব্যবধানের পর নতুনভাবে প্লেটো-অ্যারিস্টটলের রাষ্ট্রচিন্তার ধারাবাহিক বিকাশ ঘটেছে এবং ঘটে চলছে। গোটা পৃথিবীতেই আধুনিক যুগে গ্রেকো-রোমান-ইউরো-আমেরিকান সভ্যতা-সংস্কৃতির ধারা প্রভাব বিস্তার করেছে। এশিয়ায় ধর্মকে আর ইউরোপে রাষ্ট্রকে মনে করা হয়েছে সর্বজনীন কল্যাণের সর্বপ্রধান অবলম্বন। আন্ত রাষ্ট্রিক যোগাযোগ বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে পৃথিবীর সর্বত্র সব ব্যাপারেই মানুষের চিন্তা-ভাবনা আন্ত রাষ্ট্র সম্পর্কের মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়ে চলছে।

রাষ্ট্র গড়ে তোলার জন্য উদ্যোগী জনগণের স্বাধীনতা অপরিহার্য। পরাধীন জনগণের স্বাধীনতাসংগ্রাম ও স্বাধীনতা অর্জনের প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্র গঠনের চিন্তা সূচিত হতে পারে। স্বাধীনতাসংগ্রামের কালেই রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তুতি দরকার হয়। রাষ্ট্রের বিকাশ ও উন্নতির জন্য নাগরিকদের মৌলিক অধিকার, প্রয়োজনের ক্ষেত্রে আঞ্চলিক ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন এবং জাতীয় ঐক্য অপরিহার্য। জাতীয় ঐক্যের জন্য দরকার হয় বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের কিংবা বহুত্বমূলক সমন্বয়ের নীতি। রাষ্ট্র গঠনের জন্য রাষ্ট্রকাঠামো, রাষ্ট্রপ্রধান, প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিপরিষদ, বিধানসভা, প্রশাসনব্যবস্থা, বিচারব্যবস্থা, শিক্ষাব্যবস্থা, অর্থনৈতিকব্যবস্থা, নিরাপত্তাব্যবস্থা, পররাষ্ট্রনীতি ইত্যাদি নিয়ে অগ্রিম চিন্তা করতে হয়। জনসাধারণকে সামলে নিয়ে বাস্তব অবস্থা অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় আদর্শ ঠিক করতে হয়। গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ইত্যাদি আদর্শকে পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়িত করতে হয় কর্মসূচি আর কার্যক্রম দ্বারা। কর্মসূচি ও কার্যক্রম ছাড়া আদর্শের কোনো মূল্য থাকে না। এখানে কামাল আতাতুর্কের একটি কথা মনে পড়ছে। ১৯২০ সালের দিকে তুরস্কে প্রগতিশীল রাষ্ট্র গঠনের চিন্তা ও চেষ্টায় অগ্রসর হয়ে তিনি অনুভব করেছিলেন, ‘যে দেশের স্বাধীনতা থাকে না সে দেশে কেবল ধ্বংস আর মৃত্যুর রাজত্ব চলে। সমস্যা থেকে মুক্তির এবং সকল ক্ষেত্রে প্রগতির মূল শর্ত স্বাধীনতা।’ এই কথাটি তিনি বলেছিলেন রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার আগে। বাংলাদেশকে জনগণের প্রগতিশীল রাষ্ট্ররূপে গড়ে তোলার জন্য যাঁরা চিন্তা ও কাজ করেন, তাঁদের মোস্তফা কামালের এই কথাটির মর্ম, বাংলাদেশের বাস্তবতার দিকে তাকিয়ে অবশ্যই গভীরভাবে বুঝতে হবে। স্বাধীনতার অভাবে এবং পাশ্চাত্যের সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর দ্বারা পরিচালিত হওয়ার কারণে বেশির ভাগ প্রায় সব ক্ষেত্রেই বাংলাদেশে জনগণের উন্নতির সম্ভাবনা বিনষ্ট হয়ে যায়। রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন এবং প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক অধিকার ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য ছাড়া বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সমস্যাবলির ও জনজীবনের সমস্যাবলির সমাধান সম্ভব নয়।
আমাদের সামনে প্রশ্ন : গণতন্ত্র কী এবং কেন? বাংলাদেশে গণতন্ত্র কিভাবে কায়েম করা যাবে? আমার ধারণা, গণতন্ত্রের নিতান্ত প্রাথমিক ও অপরিহার্য একটি উপাদান নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার বা কর্তৃপক্ষ গঠন। গণতন্ত্রের মধ্যে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অনেক কিছু আছে, যেগুলো অবশ্যই কর্মসূচি ও কার্যক্রম দ্বারা বাস্তবায়ন করে অগ্রসর হতে হয়। গণতন্ত্রের জন্য গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল অপরিহার্য। বাংলাদেশে আমাদের সামনে প্রশ্ন : গণতন্ত্র কী? গণতন্ত্র কিভাবে কায়েম করা যাবে? অপচয়, অপব্যয়, অনাচার ও ব্যভিচার কিভাবে ‘কমানো’ যাবে? সব ক্ষেত্রে প্রগতির সূচনা কিভাবে করা যাবে? নেতৃত্বের ও জনসাধারণের মধ্যে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও চিন্তা-চেতনা দরকার। বাংলাদেশে নেতৃত্বের মধ্যে এবং জনগণের মধ্যে জাতীয় চেতনা ও রাষ্ট্রের গুরুত্ব সম্পর্কে গভীর উপলব্ধি দরকার। গতানুগতিক দ্বারা অবস্থার উন্নতি হয় না।

আমাদের আছে অন্তত হাজার বছরের লিখিত ইতিহাস। তার পেছনে আছে দীর্ঘ সময়ের আদি-ইতিহাস ও দীর্ঘতর সময়ের প্রাক-ইতিহাস। আজকের সমস্যা ও সম্ভাবনার পটভূমি হিসেবে এই গোটা ইতিহাসের বিচার-বিশ্লেষণ দরকার। অনেক সমস্যারই সূচনা সুদূর অতীতে। প্রতিটি ঐতিহাসিক পর্যায়ের প্রগতিশীল, রক্ষণশীল ও প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও জয়-পরাজয়ের মধ্য দিয়ে ইতিহাসের অগ্রগতিকে বুঝতে হবে। আমাদের উপলব্ধি করতে হবে এবং মনে রাখতে হবে যে প্রতিক্রিয়াশীলরা কায়েমি স্বার্থ বুদ্ধিবশে যেকোনো নতুন ভালো কিছুকেই বানচাল করে দিতে চায়। বাংলাদেশের গোটা ইতিহাসকে বাদ দিয়ে শুধু সাম্প্রতিক পঞ্চাশ-ষাট বছরের ঐতিহাসিক ঘটনাবলি নিয়ে, সত্যকে মিথ্যা দিয়ে ঢেকে এবং মিথ্যাকে সত্য বলে প্রচার করে হীন উপায়ে স্বার্থসিদ্ধির আয়োজন দ্বারা কারো কারো সাময়িক কিছু লাভ হলেও শেষ পর্যন্ত সবারই ক্ষতি হয়। মিথ্যা টেকে না। গতানুগতিক ধারায় বাংলাদেশে কোনো সুস্থ, স্বাভাবিক, প্রগতিশীল রাষ্ট্র গড়ে উঠবে না। পরনির্ভরতা পরাধীনতারই নামান্তর। সবচেয়ে ক্ষতিকর হলো রাজনৈতিক পরনির্ভরতা। ১৯৯০-এর দশকের শুরু থেকেই বাংলাদেশে রাজনীতিকে দেখা গেছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, ভারত ইত্যাদি রাষ্ট্রের স্থানীয় দূতাবাসগুলোর ওপর নির্ভরশীল। দেড় বছর ধরে প্রকাশ্য দিবালোকে স্থানীয় বিদেশি দূতাবাসগুলোতে বাংলাদেশের প্রধান দুই দলের নেতাদের যাতায়াত দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু এর আগে বিশ বছর প্রধান দুটি দলকে দেখা গেছে রাজনীতি নিয়ে বৃহৎ শক্তিবর্গের স্থানীয় কূটনীতিকদের মুখাপেক্ষিতা।

স্বাধীনতার কোনো বিকল্প নেই। অবশ্যই স্বাধীনতা আমাদের অর্জন করতে হবে, স্বাধীনতা রক্ষা করে চলতে হবে। স্বাধীনতাযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যে রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা আমরা অর্জন করেছিলাম, তাকে রক্ষা করা, বিকশিত করা, শক্তিশালী করা আমাদের কর্তব্য ছিল। সেই কর্তব্য কি আমরা পালন করেছি? পঞ্চাশ বছরের অভিজ্ঞতা কী? যারা স্বাধীনতাযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল, যারা আমাদের সহস্রাধিক বছরের সংস্কৃতি ও ইতিহাসকে বিবেচনায় ধরে না, তাদের থেকে আমাদের—বাংলাদেশের জনগণের—কিছুই আশা করার নেই। একসময়ে কথিত আলেমসমাজ ইসলামকে, ইসলামের ইতিহাসকে নিজেদের নেতৃত্ব রক্ষার এবং স্বার্থসিদ্ধির জন্য যেভাবে যদৃচ্ছ ব্যবহার করত, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করত, মিথ্যার আশ্রয় নিত—সেভাবে স্বাধীনতাযুদ্ধের ইতিহাসকে হীনস্বার্থে যদৃচ্ছ ব্যবহার করে, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করে আমরা কত দূর অগ্রসর হতে পারব? পিতার অপরাধের জন্য পুত্রকে শাস্তি দেওয়া, পিতার সুকর্মের জন্য পুত্রকে পুরস্কৃত করা—এই নীতি বঙ্গবন্ধুর ছিল না, ভাসানী এবং শেরেবাংলারও ছিল না। এই নীতি ন্যায়সংগত নয়।
বাংলা ভাষার দেশে দীর্ঘকাল ধরে জনগণ নিজেদের রাষ্ট্র আকাঙ্ক্ষা করেছে। তার জন্য রাজনৈতিক আন্দোলন, সাম্প্রদায়িক বিরোধ, স্বাধীনতাযুদ্ধ ইত্যাদি করা হয়েছে। কিন্তু কেমন যেন উন্মাদনার মধ্য দিয়ে ঈর্ষা অসূয়া, ঘৃণা-বিদ্বেষ, হানাহানি ও রক্তারক্তির মধ্য দিয়ে সময় কেটে গেছে, রাষ্ট্র অল্পই গঠিত হয়েছে। জনগণের রাষ্ট্র গঠন নিয়ে, গণতন্ত্র নিয়ে, রাজনৈতিক আদর্শ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা অল্পই হয়েছে। জনগণ জাগ্রত অবস্থা থেকে নিদ্রিত অবস্থায় নিপতিত হয়েছে। জনগণ ঘুমন্ত।

ব্রিটিশ শাসনামলে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের পর্যায়ে আমরা পাই সর্বভারতীয় জাতীয়তাবাদ, হিন্দু জাতীয়তাবাদ এবং মুসলিম জাতীয়তাবাদ। জাতীয়তবাদের (nationalism) জায়গায় ইংরেজ শাসকরা ভারতে সাম্প্রদায়িকতাবাদ (communalism)কথাটা চালু করে। গান্ধী, নেহরু, জিন্নাহ, লর্ড ওয়াভেল ও গর্ড মাউন্টব্যাটেনের সাম্প্রদায়িকতাবাদকে মেনে নিয়ে এবং জাতীয়তাবাদকে পরিহার করে ভারত ভাগ করে, বাংলা ভাগ করে, পাঞ্জাব ভাগ করে স্বাধীন পাকিস্তান ও স্বাধীন ভারত লাভ করে।

ভারতে বাঙালি, পাঞ্জাবি, রাজপুত, মারাঠি ইত্যাদি অন্তত পনেরোটি স্বতন্ত্র জাতি আছে এবং সেগুলো নিয়ে ভারতে অন্তত পনেরোটি স্বতন্ত্র, স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র গড়ে তোলা উচিত—এ চিন্তাও সেই সময়ে ছিল। সেটাই ছিল বাস্তবানুগ দৈশিক জাতীয়তাবাদ। এস ওয়াজেদ আলীর ‘ভবিষ্যতের বাঙালি’ গ্রন্থে এই ধারার চিন্তার পরিচ্ছন্ন প্রকাশ আছে। শেরেবাংলা উত্থাপিত ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের পটভূমিতে এই ধারার চিন্তা ছিল এবং তাতে ভারতের পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলের মুসলিম সংখ্যাধিক এলাকাগুলো নিয়ে একটি নয়, একাধিক মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব ছিল। কিন্তু এ ধারার চিন্তা সফল হয়নি; সফল হয়েছে লর্ড ওয়াভেল, লর্ড মাউন্টব্যাটেন, গান্ধী, নেহরু ও জিন্নাহর সমন্বিত চিন্তা। তাতে ব্রিটিশ সরকারের

Divide and Rule Policy-ই সফল হয়েছে।

আমাদের পাকিস্তানকালে পাকিস্তানি-জাতীয়তাবাদী শক্তির যথাসম্ভব চেষ্টা সত্ত্বেও পূর্ব বাংলায় পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদ দানা বাঁধেনি আর মুসলিম সাম্প্রদায়িকতাবাদও আবেদন হারায়। কার্যত দেখা যায়, পূর্ব পাকিস্তান পরিণত হয়েছে পাঞ্জাবের তথা পশ্চিম পাকিস্তানের উপনিবেশে। ওই বাস্তবতায় ১৯৫৪ সালে প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনের সময় প্রচারিত একুশ দফা কর্মসূচিতে লাহোর প্রস্তাবের সূত্র ধরে পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসন দাবি করা হয়। ১৯৬৬ সালে ওই লাহোর প্রস্তাবের সূত্র ধরেই শেখ মুজিব উত্থাপন করেন ছয় দফা দাবি। আওয়ামী লীগ ছয় দফা বাস্তবায়নের জন্য আন্দোলন শুরু করে। আইয়ুব সরকার, ইয়াহিয়া সরকার মারমুখো হয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর সীমাহীন নির্যাতন চালাতে থাকে। বঙ্গবন্ধুকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় জড়িয়ে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে বিচার শুরু করে। বিচারের প্রতিক্রিয়ায় পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ ঐক্যবদ্ধ হয়ে শেখ মুজিবকে, আওয়ামী লীগ ও ছয় দফাকে সমর্থন দিতে থাকে। ১৯৬৮ সালের ডিসেম্বরে মওলানা ভাসানী পল্টন ময়দানে জনসভা করে শেখ মুজিবের মুক্তি, সব রাজবন্দির মুক্তি, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার, মুসলিম লীগ ও এনএসএফের অত্যাচার বন্ধ করা, পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির দাবিতে ঘেরাও আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান। তখনই শুরু হয়ে যায় উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান। গণ-অভ্যুত্থানের মধ্যেই ১৯৬৯-এর ২২ ফেব্রুয়ারি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করে শেখ মুজিবসহ সব বন্দিকে নিঃশর্ত মুক্তি দেওয়া হয়। সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ২৪ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবকে সংবর্ধনা জানানোর জন্য রমনা রেসকোর্স ময়দানে জনসভা করে এবং সেই জনসভায় শেখ মুজিবকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

বঙ্গবন্ধু ছয় দফা কর্মসূচি এবং এর সঙ্গে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের এগারো দফা কর্মসূচি অবলম্বন করে আন্দোলন চালিয়ে যেতে থাকেন। এর মধ্যে ইয়াহিয়া সরকার জাতীয় সংসদ ও প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। বঙ্গবন্ধু কোনো অবস্থায়ই নির্বাচনের আগে কিংবা পরে ছয় দফা ও এগারো দফা অবলম্বন করে পাকিস্তানের সংবিধান প্রণয়নের প্রতিজ্ঞা থেকে সরেননি। নির্বাচনের ফলাফল, পরবর্তী ঘটনাবলি এবং স্বাধীনতাযুদ্ধ ইত্যাদি নিয়ে প্রতিনিয়ত আলোচনা হয়। এ ক্ষেত্রে মিথ্যা পরিহার্য এবং সত্য অবলম্বনীয়।

বাংলাদেশকে জাতিরাষ্ট্ররূপে প্রতিষ্ঠার ও স্বাধীন বাংলাদেশের পঞ্চাশ বছরের ইতিহাস গভীরভাবে জানা ও ইতিহাসের জ্ঞানকে জনগণের কল্যাণে কাজে লাগানো একান্ত দরকার। মনগড়া ইতিহাস নয়, চাই প্রকৃত ইতিহাস, দার্শনিক হেগেলই ইতিহাসের দর্শন গ্রন্থে প্রথম বলেছিলেন, ইতিহাসের শিক্ষা এই যে ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা গ্রহণ করেন না। কথাটা কি ঠিক? এত কালের মধ্যে আমরা কী দেখি?

আমরা দেখি, যুগান্তকারী বড় পরিবর্তনের সময়ে নেতৃত্ব ও জনগণ ইতিহাসের দিকে দৃষ্টি দেন এবং ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে, অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করেন। গতানুগতিক অগ্রগতিতে ইতিহাসের শিক্ষা মনোযোগ পায় না। ইতিহাসের গতিধারা সম্পর্কে

H.W.C Davis-এর একটি উক্তি আমরা স্মরণ করতে পারি : The present is the child of the past and the parent of the future. এই ভূভাগের জনগণের জাতি হয়ে ওঠার এবং রাষ্ট্র গঠন করার কিছু কথা এই লেখায় উল্লেখ করলাম। এসব বিষয় সবারই জানা। তবু আরো গভীরভাবে জানার এবং বাঙালি জনসাধারণকে জাতি হিসেবে বিকশিত করার ও বাংলাদেশকে জনগণের রাষ্ট্ররূপে গড়ে তোলার জন্য এই জ্ঞান একান্ত দরকার।

দুর্গাপূজার আয়োজনে ব্যাঘাত সৃষ্টির যে প্রয়াস এখন দেখা গেল তা নিয়ে গভীরভাবে ভেবে নতুন কর্মসূচি দরকার। এ সম্পর্কে দেশি-বিদেশি প্রচারমাধ্যমে যেসব কথা প্রচারিত হয়েছে, তাতে ত্রিপুরা থেকে আসাম পর্যন্ত এলাকায় হিন্দু-মুসলমানের বিরোধ পুনরুজ্জীবিত হচ্ছে বলে মনে হয়। যেসব কথা এখানে আলোচিত হলো তার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশকে ভাবতে হবে সমস্যা সমাধানের কথা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরও খবর

© ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | দৈনিক ডাক বাংলা

Theme Customized BY LatestNews