1. admin@doinikdakbangla.com : Admin :
স্কুল নয়, যেন বছরজুড়ে উৎসব » দৈনিক ডাক বাংলা
মঙ্গলবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৬:১৫ অপরাহ্ন

স্কুল নয়, যেন বছরজুড়ে উৎসব

নিজস্ব প্রতিনিধি,দৈনিক ডাকবাংলা ডট কম
  • প্রকাশের সময়: রবিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২১
  • ৪১ বার পঠিত

ইংল্যান্ডে শিক্ষাবৃত্তি নিয়ে পড়তে এসেছি আমি। এক বছরের মাস্টার্স। এ দেশে মাস্টার্সে প্রথম আট মাস সপ্তাহের পাঁচ দিন ক্লাস, শেষ চার মাস সামার ভ্যাকেশন, কোনো ক্লাস নেই। আমাদের দেশের সঙ্গে লেখাপড়ার ধরনেও পার্থক্য আছে বেশ। সবচেয়ে বড় পার্থক্য হচ্ছে, এ দেশে মাস্টার্সে হলে বসে কোনো লিখিত পরীক্ষা দিতে হয় না। ঘরে বসে নয়টা অ্যাসাইনমেন্ট করে অনলাইনে জমা দিতে হয় শুধু! তবে আমাকে আকৃষ্ট করেছে এ দেশের স্কুলের লেখাপড়ার পদ্ধতি। সেটা সত্যিই নিছক রূপকথা বলে মনে হবে তোমাদের। এখানকার স্কুলে লেখাপড়া এতটাই আনন্দময় যে সুযোগ থাকলে আমিও বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস ফেলে আবার প্রাইমারি স্কুলে গিয়ে বসে পড়তাম। কারণ, এ দেশের প্রাইমারি স্কুল তো আসলে স্কুল না, যেন বছরজুড়ে আনন্দময় এক পিকনিক বাড়ি!

বছরে ৩০ আগস্ট পর্যন্ত যেসব বাচ্চার পাঁচ বছর বয়স পূর্ণ হবে, তাদের অবশ্যই স্কুলে যেতে হবে; অর্থাৎ যেসব শিশুর জন্ম সেপ্টেম্বরের পর, তারা পাঁচ বছর পেরিয়ে প্রায় ছয় বছর বয়সে স্কুলে যায়। কিন্তু আগস্টে যাদের জন্ম, ঠিক পাঁচ বছর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই স্কুলে যেতে হয় তাদের। এখানে কোন শিশু কোন স্কুলে যাবে, সেটা নির্ভর করে সে কোন এলাকায় থাকে, তার ওপর। এক এলাকার বাসায় থেকে কোনো অবস্থাতেই অন্য এলাকার স্কুলে ভর্তি হওয়া যাবে না; অর্থাৎ ধানমন্ডি বাসা হলে মিরপুরের স্কুলে যাওয়া যাবে না কোনোভাবেই। আবার একই এলাকায় স্কুলও একটাই, মানে স্কুল পছন্দ করারও কোনো সুযোগ নেই। কেবল রাজধানী লন্ডনে কয়েকটা বেসরকারি স্কুল ছাড়া আর কোথাও কোনো বেসরকারি স্কুল নেই এবং সব বিনা মূল্যে। পুরো দেশের সব স্কুলে একই রুটিন, একই বই, একই পদ্ধতি, একই যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষক। সব শিক্ষক একই প্রশিক্ষণ নিয়ে আসা। মোটকথা গ্রাম বা শহর, রাজধানী বা দূরের কোনো উপশহর—যেখানেই পড়ুক, সবাই সমান এবং একই শিক্ষা নিয়ে বড় হবে।

আমাদের তো ভালো স্কুল বা নামকরা স্কুল বলে আলাদা ব্যাপার আছে। এখানে স্কুল–কলেজের কোনো র‌্যাঙ্কিং নেই। আমাদের দেশে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হতেই ভর্তি পরীক্ষা দিতে হয়। এখানে সেটা অকল্পনীয়। প্রাইমারি স্কুল হচ্ছে ছয় বছরের। পুরো প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষার্থীরা প্রথম পরীক্ষা দেয় স্কুল ছেড়ে যাওয়ার আগে। প্রথম শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত কোনো পরীক্ষাই নেই। ষষ্ঠ বছরে যে প্রাথমিক স্কুল সমাপনী পরীক্ষাটা হয়, সেটাতেও পাস–ফেল বা গ্রেডিং নেই। শুধু মাধ্যমিক স্কুলে যাওয়ার আগে একটা পরীক্ষা নেওয়া হয়, সেটাও পরীক্ষাপদ্ধতির সঙ্গে পরিচিত করার জন্য। এমনকি এটা বাধ্যতামূলকও নয়। কেউ অংশগ্রহণ না করলেও মাধ্যমিক স্কুলে ভর্তি হতে পারবে সরাসরি।

কত ভারী ব্যাগ নিয়ে স্কুলে যেতে হয় তোমাদের! আর এখানে পুরো প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করা যায় কোনো রকম স্কুলব্যাগ না নিয়েই। ইংল্যান্ডে বাচ্চাদের কোনো স্কুলব্যাগ নেই। পুরো প্রাথমিক শিক্ষায় নির্দিষ্ট কোনো পাঠ্যবই নেই, যা বাসায় নিয়ে পড়তে হয়। বাসায় বই–খাতা তো দূরের কথা, একটা রংপেনসিলও থাকে না। ছুটির সময় অবশ্য বই বাসায় আনা যায়, স্কুল লাইব্রেরির গল্প বা কমিকস এবং অবশ্যই নিজের পছন্দমতো। পড়াশোনা যা, সেটা স্কুলেই; বাসায় কোনো পড়া নেই। এমনকি নেই কোনো হোমওয়ার্কও। হোমওয়ার্ক থাকে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে, সেটাও ঠিক লেখাপড়া না, নানা রকম কুইজ বা ছবি আঁকাজাতীয় কিছু। সে হোমওয়ার্কের জন্য আছে নানা রকম মেডেল। উত্সাহ দেওয়ার জন্য সব বাচ্চাকেই দেওয়া হয় এগুলো। স্কুল শেষে কোচিং বা বাসায় এসে টিউটর বলে কিছু এখানে নেই। স্কুল খোলা থাকে সপ্তাহে পাঁচ দিন। প্রতি ছয় সপ্তাহ পর আবার এক সপ্তাহ বন্ধ। ডিসেম্বরে ক্রিসমাস ছুটি দুই সপ্তাহ, আবার এপ্রিলে দুই সপ্তাহ ইস্টারের ছুটি। ছয় সপ্তাহের গ্রীষ্মকালীন ছুটি জুন–জুলাইয়ে। মোটকথা, বছরে স্কুলে ক্লাস হয় ঠিক ১৮০ দিন, মানে ছয় মাস ক্লাস আর ছয় মাস ছুটি!

স্কুলে টিফিন নেওয়ার সুযোগ নেই। স্কুলেই খাওয়ানো হয় সবাইকে। একেক দিন একেক খাবার। সপ্তাহে এক দিন আবার রান্নাও শেখানো হয় সবাইকে। সবাইকে কিছু না কিছু তৈরি করতে হয় সেদিন। ছোটবেলা থেকেই বাচ্চাদের রান্না শেখানোর কারণও আছে। বড় হলে সবাইকে নিজে রান্না করতে হয় এখানে। শুধু খাবার নয়, কোন খাবারে কী পুষ্টিগুণ, শেখানো হয় সেটাও। ক্লাস টুতে পড়া একটা বাচ্চাও দেখে কোন খাবারে কত ভাগ ফ্যাট আর ক্যালরি আছে।

সকাল আটটা থেকে বেলা সাড়ে তিনটা পর্যন্ত স্কুল। শীতকালে সূর্যোদয় হয় সাড়ে আটটায়। বাচ্চারা যখন স্কুলে যায়, তখন তো ভোররাত প্রায়। শীত বা গ্রীষ্মকাল স্কুলের সময় একই। এই সময়ের মধ্যে মাঠে খেলতে হয় দুই ঘণ্টা। সব ধরনের খেলাই শেখানো হয়। বিশেষ কোনো খেলায় কারও আগ্রহ বেশি হলে সপ্তাহে দুই দিন শুধু ওই খেলার জন্য কোচের কাছে যেতে হয় তাকে। ক্যাম্পেও পাঠানো হয় মাঝেমধ্যে। মাধ্যমিকে পড়ার সময় স্কুল কোচ যদি মনে করেন কোনো বিশেষ খেলায় যেমন ফুটবল বা ক্রিকেটে কেউ ভালো করছে, তাকে ভর্তি করিয়ে দেওয়া হয় স্থানীয় ক্লাবে। বছরের ছয় মাস প্রায় প্রতিদিনই বৃষ্টি থাকায় মাঠের পাশাপাশি ইনডোর গেমসের ব্যবস্থা আছে সব স্কুলে। ক্লাস থ্রি থেকে সপ্তাহে এক দিন সুইমিংপুলে সাঁতার শিখতে হয় বাধ্যতামূলকভাবে। সব স্কুলে আছে ব্যায়ামাগার। সপ্তাহে এক দিন সেই ব্যায়ামাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। সেদিন স্কুল ইউনিফর্মের সঙ্গে নিতে হয় সাঁতারের পোশাকও। চাইলে অবশ্য স্কুলে রেখেও আসা যায় এসব পোশাক, সবার নিজের নামে লকার আছে স্কুলে।

এক কক্ষে শিক্ষার্থী থাকে ২৫ জন। প্রতি ক্লাসের জন্য একজন করে শিক্ষক। ব্রিটেনে একেবারে বিশ্ববিদ্যালয়ের আগ পর্যন্ত একমুখী শিক্ষা, মানে বিজ্ঞান, ব্যবসায় শিক্ষা বা মানবিক বলে আলাদা কোনো শাখা নেই। সবাইকে সব বিষয়ই পড়তে হয়। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই সেটার শুরু। বিজ্ঞান বোঝাতে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই ল্যাবে গিয়ে বিজ্ঞানের ছোট ছোট বিষয় হাতে–কলমে করে দেখানো হয়। ব্যবসা বোঝার জন্য থাকে ছোট ছোট প্রকল্পের আয়োজন। সমাজ বোঝাতে প্রায়ই মাঠপর্যায়ে পরিদর্শনে নিয়ে যাওয়া হয় শিক্ষার্থীদের।

যেহেতু কোনো পরীক্ষা নেই, তাই ক্লাসে নেই কোনো মেধাক্রম। সবাই সমান। বাচ্চারা যেন ছোটবেলা থেকে ‘সবাই সমান’ মনোভাব নিয়ে বড় হয়, সে লক্ষ্যেই করা হয় এটা। বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা হয়, কিন্তু সেখানেও কোনো একক অংশগ্রহণ নেই। ফলে একই সঙ্গে দল হিসেবে কাজ করার গুণও তৈরি হয় সবার মাঝে।

স্কুলের সময় কারও জন্মদিন থাকলে ক্লাসে জন্মদিন উত্সব উদ্‌যাপন করা হয়। যার জন্মদিন, সে শুধু চকলেট নিয়ে যায় অন্যদের জন্য। এ ছাড়া বছরজুড়ে নানা উত্সব তো থাকেই। সেসব উত্সবের জন্য আবার আছে বিশেষ বিশেষ পোশাক। সবচেয়ে বেশি যেটা হয় সেটা হলো, পছন্দের যেকোনো কার্টুন চরিত্রের পোশাকে স্কুলে যাওয়া।

এত সব উত্সব আয়োজনের ভেতর পড়াশোনাও হয়ে যায় গল্পে গল্পে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় সব বই-ই কমিকস আকারে লেখা। শিক্ষকেরা গল্পের ছলে শিখিয়ে ফেলেন বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস, মিসরীয় সভ্যতার ইতিহাস। এখানকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষককে অবশ্যই মাস্টার্স পাস হতে হবে। নিয়োগ পাওয়ার পর শিশুদের মনস্তত্ত্ব বুঝতে বা শিশুদের কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, সে বিষয়ে নিতে হয় দীর্ঘ প্রশিক্ষণ। এ দেশে বাচ্চাদের নিজের মা-বাবাই মারতে পারেন না, আর স্কুলের শিক্ষক মারবেন, সে তো অসম্ভব। কেউ যত বিরক্তই করুক না কেন, তার প্রতি ন্যূনতম বিরক্তি পর্যন্ত প্রকাশ করতে পারেন না শিক্ষক। তবে প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকতা পেশা হিসেবে খুবই সম্মানের। সম্মানীও ভালো। ১০ বছরের অভিজ্ঞ একজন শিক্ষকের সম্মানী এ দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের সমান।

আমাদের দেশে আচার–ব্যবহার পারিবারিক শিক্ষা ভাবা হলেও এখানে সেটা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা। কীভাবে রাস্তা পার হতে হবে, ফুটপাতে কীভাবে হাঁটতে হবে, কীভাবে ময়লা ডাস্টবিনে ফেলতে হবে, মজা করেও মিথ্যা না বলা, কীভাবে কাউকে সম্ভাষণ করতে হবে, সবাইকে ধন্যবাদ বা দুঃখিত বলার চর্চা—এসব মূলত প্রাথমিক স্কুলে শেখানো হয়। এ দেশের সব স্কুলেই পৃথিবীর বহু দেশের বাচ্চারা পড়ে। পারিবারিকভাবে শিখতে গেলে তাই তাদের আচার–আচরণ ভিন্ন হতে পারে। সে জন্যই স্কুলে এসব শেখানো হয়, যেন অভিন্ন মূল্যবোধ ও আচরণ নিয়ে বেড়ে ওঠে সবাই। ব্রিটিশদের ভদ্রতা আর সহনশীলতা তাই মুগ্ধ করতে বাধ্য!

তবে স্কুল কামাই দেওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের শিক্ষকেরা যতটা সহনশীল, এখানে তার উল্টো। কোনোভাবেই স্কুল কামাই দেওয়া যাবে না। দিলে অভিভাবককে জবাবদিহির পাশাপাশি গুনতে হয় মোটা অঙ্কের জরিমানা। তাই বলে বাচ্চারা অসুস্থ হলেও কি স্কুলে যায়? না! হুট করে কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে অসুস্থ অবস্থায় স্কুলে নিয়ে যেতে হবে। স্কুলে থাকা চিকিত্সক তার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে যদি ক্লাস না করার অনুপযোগী মর্মে ছাড়পত্র দেন, তবেই স্কুল থেকে মাফ পাওয়া যাবে। তবে স্কুল বন্ধ থাকলেই বরং মন খারাপ করে থাকে বাচ্চারা। কারণ স্কুলকে আকর্ষণীয় করার জন্য এত এত আয়োজন যে কোনো বাচ্চাই ঘরে থাকতে চাইবে না।

বছর শেষে সব শিক্ষার্থীর পিকনিকের ব্যবস্থা থাকে। প্রথম শ্রেণির বাচ্চাদেরও অভিভাবক ছাড়া শুধু শিক্ষকদের সঙ্গে পিকনিকে যেতে হয়। স্কুল কর্তৃপক্ষই পিকনিকে বাচ্চাদের ছবি তুলবে, নির্বাচিত ছবি আপলোড করা হবে স্কুলের ওয়েবসাইটে। আমাদের দেশে বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করার পর যেমন সমাবর্তন হয়,একই আদলে এখানে প্রাথমিক বা মাধ্যমিক স্কুল শেষে করা হয় সমাবর্তন অনুষ্ঠান। প্রতিবছর শেষ ক্লাসের দিন শিক্ষকের জন্য উপহার নিয়ে যায় শিক্ষার্থীরা। আর সেদিন পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয় পরের বছরের শিক্ষকের সঙ্গে।

প্রতিবছর এ রকম নতুন নতুন অনেক আয়োজন নিয়ে চলছে এই স্কুলগুলো। নিজের স্কুলজীবনের অভিজ্ঞতার কথা মনে করে তাই মনে মনে কেবল বলি, আহা, আমাদের স্কুলগুলো যদি এমন হতো!

সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরও খবর

© ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | দৈনিক ডাক বাংলা

Theme Customized BY LatestNews