1. admin@doinikdakbangla.com : Admin :
‘স্বাধীনতা’ হারাচ্ছে বিটিআরসি » দৈনিক ডাক বাংলা
শনিবার, ১৯ জুন ২০২১, ০৮:৪১ পূর্বাহ্ন

‘স্বাধীনতা’ হারাচ্ছে বিটিআরসি

নিজস্ব প্রতিনিধি,দৈনিক ডাকবাংলা ডট কম
  • প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ৯ অক্টোবর, ২০২০
  • ১১৫ বার পঠিত

১০ বছর আগে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন বা বিটিআরসির ক্ষমতা অনেকাংশে খর্ব করার পর এবার এই স্বাধীন কমিশনের স্বাধীনতাই কেড়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ। সরকারের এ বিভাগ বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইন-২০০১ সংশোধনের যে খসড়া প্রস্তুত করেছে তাতে বিটিআরসি বিষয়ে বিদ্যমান ‘একটি স্বাধীন কমিশন প্রতিষ্ঠা’ শব্দগুলোর পরিবর্তে লেখা হয়েছে ‘সরকারের একটি কমিশন প্রতিষ্ঠা’। ‘সংবিধিবদ্ধ সংস্থা’ শব্দ দুটি বাদ দিয়ে লেখা হয়েছে ‘সরকারের একটি সংবিধিবদ্ধ সংস্থা’। বিদ্যমান আইনের ২১ ধারায় টেলিযোগাযোগ খাত থেকে আয় বিটিআরসির নিজস্ব তহবিলে জমা রাখার বিধান আছে। সেটি সংশোধন করে সরকারি কোষাগারে জমার বিধান করা হচ্ছে।

২০০১ সালের প্রণীত টেলিযোগাযোগ আইনের প্রস্তাবনায় বলা ছিল, ‘যেহেতু বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও দক্ষ নিয়ন্ত্রণ এবং টেলিযোগাযোগ সেবা নিয়ন্ত্রণের নিমিত্তে একটি স্বাধীন কমিশন প্রতিষ্ঠা, ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের ক্ষমতা, কার্যাবলি ও দায়িত্ব কমিশনের কাছে হস্তান্তর এবং আনুষঙ্গিক বিষয় সম্পর্কে বিধান করা সমীচীন, সেহেতু এতদ্বারা নিম্নরূপ আইন করা হইল।’
২০১০ সালে মূল আইন সংশোধন করে প্রস্তাবনা অংশে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের ‘ক্ষমতা’ পরিবর্তন করে ‘কতিপয় ক্ষমতা’ করা হয়। আর এবার ‘স্বাধীন’ শব্দটিই বিলুপ্ত করা হচ্ছে।

২০১০ সালের আগে মূল আইনের ৩১ ধারায় কমিশনের ক্ষমতা বিষয়ে বলা ছিল, কমিশন টেলিযোগাযোগ সেবা বিষয়ে বিভিন্ন ধরনের লাইসেন্স প্রদান, তা বাতিল করা, বেতার ফ্রিকোয়েন্সি বরাদ্দ, টেলিযোগাযোগ সেবার ট্যারিফ, কলচার্জ নির্ধারণ ইত্যাদি ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবে। কিন্তু এই ক্ষমতা আংশিক খর্ব করে ২০১০ সালের সংশোধিত আইনে লাইসেন্স দেওয়ার, লাইসেন্স হস্তান্তর বা বাতিল করার ক্ষেত্রে সরকারের অনুমোদন নেওয়ার বিধান করা হয়। আর এবার বেতার ফ্রিকোয়েন্সি বরাদ্দ, এর ব্যবহারের কর্তৃত্ব প্রদান, বেতার ফ্রিকোয়েন্সি ব্যবহারের পরিবীক্ষণ ও স্পেকট্রাম ব্যবস্থাপনায়ও সরকারের অনুমতি নেওয়ার বিধান করা হচ্ছে।

মূল আইনের ১ ধারায় আইনটির শিরোনাম ছিল ‘বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ আইন’। ২০১০ সালে এটা পাল্টে করা হয় ‘বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইন’। এবার শিরোনাম থেকে ‘নিয়ন্ত্রণ’ শব্দটি বাদ দেওয়া হচ্ছে।
মূল আইনের ২১ ধারায় বলা ছিল, কমিশনের ‘বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন তহবিল’ নামে একটি তহবিল থাকবে। ওই তহবিলে বিভিন্ন অনুদান, প্রাপ্ত ঋণ এবং টেলিযোগাযোগ খাত থেকে বিভিন্ন আয়ের টাকা জমা হবে। এই বিধান সংশোধন করে সংশোধিত আইনের খসড়ায় বলা হয়েছে, এসব টাকা সরাসরি সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হবে।

এবারের আইনের খসড়ায় আইনটির প্রয়োগ অংশে নতুন একটি উপধারা সংযুক্ত করে তাতে এই মর্মে বলা হয়েছে যে, যদি কোনো ব্যক্তি বাংলাদেশের বাইরে থেকে এ দেশের কোনো টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা বা যন্ত্রপাতি বা বেতার ব্যবস্থার সাহায্যে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড করে তাহলে ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে এ আইন এমনভাবে প্রয়োগ করা যাবে যে, অপরাধটি বাংলাদেশের ভেতরেই সংঘটিত হয়েছে।

এ ছাড়া মূল আইনের ৮২ নম্বর ধারায় টেলিযোগাযোগ অপারেটর ও ব্যবহারকারীদের মধ্যে বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য নতুন একটি উপধারা যোগ করা হয়েছে। আর ৮৩ ধারায় নতুন একটি উপধারা সংযোজন করে কমিশনের প্রধান কার্যালয়ে একটি তথ্য কোষ রাখার কথা বলা হয়েছে।

সংশোধিত এই আইনের খসড়া সম্পর্কে সম্প্রতি মন্ত্রণালয় থেকে বিটিআরসির মতামত চাওয়া হলে এ প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। কমিশন এ ধরনের সংশোধনীর বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয়কে মতামত জানানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।

এ বিষয়ে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার গতকাল শুক্রবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিটিআরসি সরকারের অধীনে থাকলে ক্ষতি কী? বিটিআরসি সরকার বা মন্ত্রণালয়কে পাশ কাটিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে না, নেওয়া উচিত না। সরকারকে না জানিয়ে কিছু করা উচিত না। ওভার অল বিটিআরসির ওপর মন্ত্রণালয়ের সুপারভিশন থাকতে হবে। আর বিটিআরসি জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের মতো কোনো কমিশন না।’

২০০১ সালে একটি স্বাধীন কমিশন হিসেবে বিটিআরসিকে প্রতিষ্ঠা করা এবং ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের ক্ষমতা এ কমিশনের কাছে হস্তান্তর করা ভুল ছিল কি—এ প্রশ্নের জবাবে মোস্তাফা জব্বার বলেন, ‘তখন যেটা সঠিক বিবেচনা করা হয়েছে তা করা হয়েছে। এখন আমাদের বর্তমান বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে কাজ করতে হবে।’

মন্ত্রী আরো বলেন, ‘টেলিযোগাযোগ আইন সংশোধনের খসড়াটি আমার বিভাগের কর্মকর্তারা প্রস্তুত করেছেন। এটা এখনো আমার টেবিলে আসেনি।’

অন্যদিকে বিটিআরসির চেয়ারম্যান মো. জহিরুল ইসলাম এ বিষয়ে এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘টেলিযোগাযোগ আইন এভাবে সংশোধন করা হলে বিটিআরসির মতো একটি গুরুত্ব প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়ে যাবে।

এতে আমলাতন্ত্রের কবলে পড়বে টেলিযোগাযোগ খাত এবং এর নিয়ন্ত্রণে স্বচ্ছতা থাকবে না।’

তিনি আরো বলেন, ‘ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সচিবের অধীনে রয়েছে বিটিসিএল, টেলিটকসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠান আজ পর্যন্ত লাভের মুখ দেখেনি। বিটিআরসি বিটিসিএলের কাছে ২২০০ কোটি টাকা এবং টেলিটকের কাছে ১৮০০ কোটি টাকা পাবে। সে টাকা এ দুটি প্রতিষ্ঠান পরিশোধ করছে না। অন্যদিকে বিটিআরসির মাধ্যমে সরকারের হাজার হাজার কোটি টাকা আয় হচ্ছে। এ অবস্থায় বিটিআরসির পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে চলে গেলে রাষ্ট্র ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’

আঞ্চলিক টেলিযোগাযোগ গবেষণা প্রতিষ্ঠান লার্ন এশিয়ার সিনিয়র রিসার্চ ফেলো আবু সাঈদ খান বলেন, এ আইনের কোনো ধরনের পরিবর্তন করতে হলে গণশুনানি করতে হবে। গণশুনানি ছাড়া এ ধরনের আইনের পরিবর্তন আনার বিষয়টি হচ্ছে স্বৈরাচারের বহিঃপ্রকাশ। এ ধরনের ঘটনা জনস্বার্থ, রাষ্ট্র ও বিনিয়োগবিরোধী।

প্রসঙ্গত, ২০১০ সালে বিটিআরসির ক্ষমতা খর্ব করে টেলিযোগাযোগ আইন সংশোধন করলে সে সময় অনেকের আশঙ্কা ছিল, এতে বিটিআরসি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের একটি আজ্ঞাবহ সংস্থায় পরিণত হবে। তখন বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা এ ধরনের আইন সংশোধনের উদ্যোগে উদ্বেগ প্রকাশ করে।

এর আগে ‘বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ আইন-২০০১’ তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার আমলে প্রণীত টেলিযোগাযোগ নীতিমালা-১৯৯৮-এর আলোকে দেশের দক্ষ পরামর্শক ও আইনজীবীদের সহায়তায় প্রণীত হয়। এ আইনের মাধ্যমেই গঠিত হয় বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন বা বিটিআরসি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরও খবর

© ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | দৈনিক ডাক বাংলা

Theme Customized BY LatestNews